সাধারণ জ্ঞান

পাসপোর্ট করার নিয়ম ২০২৬

পাসপোর্ট করার নিয়ম ২০২৬

পাসপোর্ট করার নিয়ম ২০২৬: সম্পূর্ণ গাইডলাইন

আপনারা যারা বিদেশে যেতে চান, তাদের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাগজপত্র হলো পাসপোর্ট। আগামী ২০২৬ সালে পাসপোর্ট করার প্রক্রিয়া কেমন হবে, কী কী পরিবর্তন আসতে পারে, বা বর্তমান নিয়মের কোন দিকগুলো তখনও বহাল থাকবে – সে বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৩ সাল থেকে ই-পাসপোর্টের প্রচলন শুরু হওয়ার পর থেকে পাসপোর্ট সংক্রান্ত অনেক নিয়মের পরিবর্তন এসেছে। ২০২৬ সালে এই প্রক্রিয়া আরও সহজ ও ডিজিটাল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আজকের এই ব্লগ পোস্টে আমরা ২০২৬ সালের সম্ভাব্য পাসপোর্ট করার নিয়মাবলী এবং আনুষঙ্গিক সবকিছু বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।

ভূমিকা: কেন পাসপোর্ট জরুরি?

পাসপোর্ট শুধু একটি ভ্রমণ নথি নয়, এটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আপনার পরিচয়পত্র। শিক্ষা, চিকিৎসা, চাকরি, ব্যবসা, বা স্রেফ পর্যটনের উদ্দেশ্যে বিদেশে যেতে হলে পাসপোর্ট অপরিহার্য। বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য ই-পাসপোর্ট চালু হওয়ার পর থেকে এই প্রক্রিয়া আরও আধুনিক ও সুরক্ষিত হয়েছে। ২০২৬ সাল নাগাদ এই ডিজিটালাইজেশন আরও উন্নত হবে বলে আশা করা যায়, যা পাসপোর্ট প্রাপ্তির প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত এবং ঝুঁকিমুক্ত করবে।

ই-পাসপোর্ট: ২০২৬ সালেও এটিই থাকবে মান

২০২৬ সালেও বাংলাদেশে ই-পাসপোর্টই চালু থাকবে। ই-পাসপোর্ট বা ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট হলো একটি বায়োমেট্রিক পাসপোর্ট, যেখানে একটি মাইক্রোচিপ এমবেড করা থাকে। এই চিপে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য, যেমন - নাম, ঠিকানা, জন্মতারিখ, ছবি, ফিঙ্গারপ্রিন্ট, এবং আইরিশ স্ক্যান সুরক্ষিতভাবে জমা থাকে। এটি জালিয়াতি রোধে বিশেষভাবে কার্যকর।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: হাতে লেখা পাসপোর্ট বা পুরোনো এমআরপি-এর মেয়াদ শেষ হলে আপনাকে ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে হবে।

পাসপোর্ট আবেদনের প্রক্রিয়া: ধাপে ধাপে নির্দেশনা

২০২৬ সালেও পাসপোর্ট আবেদনের প্রাথমিক প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন হবে। এটি মূলত বর্তমান নিয়মেরই ধারাবাহিকতা।

১. অনলাইন আবেদন ফরম পূরণ:

  • প্রথমে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে (www.epassport.gov.bd) প্রবেশ করুন।
  • "Apply Online" অপশনে ক্লিক করে ই-পাসপোর্ট আবেদন ফরম পূরণ শুরু করুন।
  • ব্যক্তিগত তথ্য (নাম, ঠিকানা, জন্মতারিখ, পেশা ইত্যাদি), পিতা-মাতার বিবরণ, স্বামী/স্ত্রীর তথ্য (যদি প্রযোজ্য হয়), এবং যোগাযোগের ঠিকানা নির্ভুলভাবে পূরণ করুন।
  • জরুরি যোগাযোগের জন্য একজন ব্যক্তির তথ্য (নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর) অবশ্যই দিতে হবে।
  • আপনি সাধারণ (Regular) নাকি জরুরি (Express) ডেলিভারি চান, তা নির্বাচন করুন। আবেদনের ধরনের উপর ফি নির্ভর করবে।

২. ফি পরিশোধ:

  • অনলাইন ফরম পূরণের পর আপনার পছন্দসই ডেলিভারি ক্যাটাগরি অনুযায়ী ফি নির্ধারিত হবে। এই ফি অনলাইনে অথবা অফলাইনে পরিশোধ করা যাবে।
  • অনলাইন: বিকাশ, নগদ, রকেট, বা বিভিন্ন ব্যাংকের ডেবিট/ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে পরিশোধ করা যেতে পারে।
  • অফলাইন: ব্যাংক চালানের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, এবং ঢাকা ব্যাংকের নির্ধারিত শাখায় ফি জমা দেওয়া যাবে। চালানের কপি যত্ন করে রাখুন।
  • ২০২৬ সাল নাগাদ অনলাইন পেমেন্ট পদ্ধতি আরও বিস্তৃত ও সুরক্ষিত হবে বলে আশা করা যায়।

৩. আবেদনের সারণীভুক্তকরণ (Scheduling):

  • ফি পরিশোধের পর আপনার আবেদনের একটি সারসংক্ষেপ প্রিন্ট করে নিন।
  • এরপর আপনার নিকটস্থ পাসপোর্ট অফিস নির্বাচন করে অ্যাপয়েন্টমেন্টের তারিখ ও সময় নির্ধারণ করুন।

৪. পাসপোর্ট অফিসে জমা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (সাধারণত): আবেদনের দিন কিছু মূল কাগজপত্র এবং ফটোকপি সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। ২০২৬ সালেও এগুলি একই থাকতে পারে:

  • আবেদন ফরমের প্রিন্ট কপি: অনলাইনে পূরণ করা আবেদন ফরমের প্রিন্ট কপি।
  • এপয়েন্টমেন্ট স্লিপ: অ্যাপয়েন্টমেন্ট তারিখ ও সময় সম্বলিত প্রিন্ট কপি।
  • জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) / জন্ম নিবন্ধন সনদ (BRC): মূল এবং ফটোকপি (যদি ১৮ বছরের নিচে হয়)। ১৮ বছর পূর্ণ না হলে পিতামাতার NID প্রয়োজন হবে।
  • পুরোনো পাসপোর্টের ফটোকপি (যদি থাকে): রিনিউয়াল বা রি-ইস্যুর ক্ষেত্রে পুরোনো পাসপোর্টের তথ্য পাতা ও বায়োমেট্রিক পাতা।
  • ফি পরিশোধের রশিদ: অনলাইন বা অফলাইনে পরিশোধ করা ফির মূল রশিদ।
  • ঠিকানার প্রমাণপত্র (যদি NID-এর ঠিকানার সাথে বর্তমান ঠিকানা ভিন্ন হয়): ইউটিলিটি বিলের কপি (বিদ্যুৎ/গ্যাস/পানি)।
  • পেশাগত সনদের কপি (যদি প্রয়োজন হয়): সরকারি চাকরিজীবী হলে এনওসি (No Objection Certificate) / জিও (Government Order) এর মূল কপি। শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা অন্যান্য পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে পেশাগত সনদের কপি চাইতে পারে।
  • বিবাহ সনদ (যদি স্বামী/স্ত্রীর তথ্য যোগ করতে চান): মূল ও ফটোকপি।

৫. বায়োমেট্রিক ও ছবি গ্রহণ:

  • নির্ধারিত তারিখে এবং সময়ে পাসপোর্ট অফিসে উপস্থিত থাকুন।
  • দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আপনার কাগজপত্র যাচাই করবেন।
  • এরপর আপনার ছবি তোলা হবে, ফিঙ্গারপ্রিন্ট এবং আইরিশ স্ক্যান নেওয়া হবে। এই ধাপেই আপনার তথ্য চিপে এনকোড করা হবে।
  • একটি চূড়ান্ত যাচাইয়ের জন্য আপনাকে একটি প্রিন্ট কপি দেখানো হবে। কোনো ভুল থাকলে সেখানেই সংশোধন করিয়ে নিন।

পুলিশ ভেরিফিকেশন

আবেদন প্রক্রিয়ার এই ধাপটি এখনও অপরিহার্য। আপনার স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানায় পুলিশ ভেরিফিকেশন করা হবে। পাসপোর্টের জন্য আবেদনের পর পুলিশ তথ্য যাচাই করে একটি ইতিবাচক বা নেতিবাচক রিপোর্ট দেবে। সাধারণত কোনো জটিলতা না থাকলে এই ভেরিফিকেশন দ্রুত সম্পন্ন হয়।

পাসপোর্ট ডেলিভারি ও সংগ্রহ

পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর এবং অন্যান্য ধাপ সফলভাবে পেরোলে আপনার পাসপোর্ট প্রিন্ট করা হবে।

  • পাসপোর্ট রেডি হলে আপনি মোবাইলে SMS এর মাধ্যমে নোটিফিকেশন পাবেন।
  • এই SMS পাওয়ার পর নির্ধারিত পাসপোর্ট অফিস থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে পারবেন।
  • পাসপোর্ট সংগ্রহ করার সময় আবেদনপত্র, ডেলিভারি স্লিপ (যদি থাকে), এবং আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে নিয়ে যান।

বিভিন্ন প্রকার ডেলিভারি এবং ফি (সাধারণত ২০২৬ সালেও একই থাকবে)

সাধারণত পাসপোর্টের ডেলিভারি নিম্নলিখিত তিন ধরনের হয়ে থাকে, যার ওপর ভিত্তি করে ফি নির্ধারিত হয়:

ধরনসময়সীমা (সাধারণত)
রেগুলার ডেলিভারি১৫-২১ কার্যদিবস
এক্সপ্রেস ডেলিভারি৭-১৪ কার্যদিবস
সুপার এক্সপ্রেস২-৭ কার্যদিবস

দ্রষ্টব্য: উল্লিখিত সময়সীমা অনুমানিক এবং অফিসিয়াল নিয়ম অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। জাতীয় ছুটির দিন বা অন্যান্য বিশেষ পরিস্থিতিতে ডেলিভারির সময় বেশি লাগতে পারে। ফি সাধারণত পৃষ্ঠার সংখ্যা (৪৮ বা ৬৪ পাতা) এবং মেয়াদ (৫ বা ১০ বছর) এর উপরও নির্ভরশীল হয়। ২০২৬ সালে ফি কিছুটা বাড়তে পারে, তবে মূল কাঠামো একই থাকবে।

পাসপোর্ট রিনিউয়াল বা রি-ইস্যু করার নিয়ম

যদি আপনার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যায় বা কোনো তথ্য সংশোধন করতে চান, তাহলে আপনাকে রিনিউয়াল বা রি-ইস্যুর জন্য আবেদন করতে হবে। এর প্রক্রিয়াও নতুন আবেদনের মতোই। তবে এক্ষেত্রে আপনাকে পুরোনো পাসপোর্টের ফটোকপি (তথ্য পাতা ও বায়োমেট্রিক পাতা) এবং মূল পাসপোর্ট সাথে নিয়ে যেতে হবে। যদি কোনো ভুল তথ্য সংশোধন করতে চান, তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র (যেমন – ম্যারেজ সার্টিফিকেট, শিক্ষাগত সনদ) জমা দিতে হবে।

উপসংহার / FAQ

২০২৬ সালের পাসপোর্ট তৈরির প্রক্রিয়া প্রধানত বর্তমান ই-পাসপোর্ট সিস্টেমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে, তবে প্রযুক্তির প্রভাবে এটি আরও সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হবে বলে আশা করা যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সমস্ত তথ্য নির্ভুলভাবে পূরণ করা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ):

  • প্রশ্ন: অনলাইনে আবেদন করার সময় কি ভুল হলে সংশোধন করা সম্ভব? উত্তর: চূড়ান্ত সাবমিট করার আগে পর্যন্ত আপনি তথ্যাদি সংশোধন করতে পারবেন। একবার সাবমিট হয়ে গেলে, পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে ভুল সংশোধন করার সুযোগ থাকে, সেক্ষেত্রে এক্সট্রা ফি লাগতে পারে।

  • প্রশ্ন: অপ্রাপ্তবয়স্কদের (১৮ বছরের কম) জন্য পাসপোর্ট করার নিয়ম কি? উত্তর: ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য জন্ম নিবন্ধন সনদ, পিতা-মাতার জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, এবং পিতা-মাতার উপস্থিতিতে বায়োমেট্রিক গ্রহণ করা হয়।

  • প্রশ্ন: সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য কি বিশেষ কোনো নিয়ম আছে? উত্তর: হ্যাঁ, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য NID/BRC এর পাশাপাশি NOC (No Objection Certificate) বা GO (Government Order) জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।

  • প্রশ্ন: পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে বা নষ্ট হলে কী করব? উত্তর: পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে নিকটস্থ থানায় জিডি করতে হবে। জিডির কপি সহ নতুন পাসপোর্ট (রি-ইস্যু) এর জন্য আবেদন করতে হবে। নষ্ট হলে নষ্ট পাসপোর্টের কপি এবং নতুন আবেদনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

  • প্রশ্ন: আমার স্থায়ী ঠিকানা এক জেলায় এবং বর্তমান ঠিকানা অন্য জেলায়, আমি কোন অফিস থেকে আবেদন করব? উত্তর: আপনি আপনার বর্তমান বা স্থায়ী যেকোনো ঠিকানার সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট অফিস থেকে আবেদন করতে পারবেন। তবে পুলিশ ভেরিফিকেশন উভয় ঠিকানাতেই হতে পারে।

আশা করি এই ব্লগ পোস্টটি ২০২৬ সালে পাসপোর্ট করার নিয়মাবলী সম্পর্কে আপনার একটি স্পষ্ট ধারণা দিতে পেরেছে। নিরাপদে এবং দক্ষতার সাথে আপনার পাসপোর্ট সংগ্রহ করুন!

শেয়ার করুন:FacebookTwitterWhatsApp